স্বরূপকাঠির ভাসমান হাট ঘিরে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা (ফটো অ্যালবাম)

    প্রকাশিতঃ ৯ আগস্ট, ২০১৬ আপডেটঃ ৮:৩০ অপরাহ্ণ

    প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানা। ৫২২ হেক্টর জমিতে প্রায় ৪০ বছর ধরে এখানে চাষ হয় বাংলার আপেল খ্যাত পেয়ারার। এই কৃষিপণ্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ভাসমান পেয়ারা, ফুল, তৈরি নৌকা ও সবজির হাট। দেশে এত বড় ভাসমান হাট আর কোথাও নেই।

    স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন ৫ থেকে দশ লাখ টাকার পণ্য বেঁচা কেনা চলে এই ভাসমান হাটে। কখনও কখনও মৌসুম ভেদে কোটি টাকা পর্যন্ত ওঠে।  দক্ষিণের জল ও জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের বসবাসরত মানুষের জীবিকা। অনেকেই মনে করেন থাইল্যন্ডের “ফ্লোয়েটিং মার্কেটের” পর এটিই পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাসমান হাট।

    বছরের প্রায় ১২ মাসই এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের পসরা সাজায় এই ভাসমান হাটে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার প্রচারণার পর কোন সরকারি - বেসরকারি উদ্যোগ ছাড়াই বেড়েছে পর্যটকদের ভীড়। শুধু লাগেনি উন্নয়নের ছোঁয়া।

    সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার বেশীরভাগ মানুষেরই জীবন-জীবিকা নির্ভর করে এক ফসলি ফল পেয়ারার উপর। উন্নত যোগাযোগের অভাবে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে নৌকায়ই এ অঞ্চলের ব্যবসা-বানিজ্যের প্রধান মাধ্যম। তাই আটঘর-কুড়িয়ানার ভীমরুলি খালে গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ পেয়ারার ভাসমান হাট। যখন পেয়ারা মৌসুম শেষ হয় তখন এ অঞ্চলের কৃষকরা মনোনিবেশ করেন গাছের চারা, সবজি উৎপাদন, তরমুজ ও ফুল গাছের চারা উৎপাদনে যেগুলো বিক্রি হয় এই ভাসমান হাটে। তাই দিনে দিনে পর্যটক ও ক্রেতাদের কাছে বেড়েছে এর আকর্ষণও।

    যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত হলেও আকর্ষণীয় এই হাটে দেশী বিদেশীদের আনাগোনায় এটি রূপ নিয়েছে পর্যটন কেন্দ্রে। স্ব-পরিবারে, বয়স ভেদে গ্রুপ করে প্রতিদিন ৪শ’ থেকে ৫শ’ পর্যটক দেখতে আসেন জল ও নৌকার সমন্বয় গড়ে ওঠা এই বৃহৎ ভাসমান বাজার। এখানে আসা পর্যটকরা মনে করেন থাইল্যন্ডের ‘ফ্লোয়েটিং মার্কেটের’ পর এটিই পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাসমান হাট।

    কথা হলো ঢাকা থেকে আসা একটি গ্রুপের ৮০ জন পর্যটকের সঙ্গে স্ব-পরিবারে আসা তেঁজগাও সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের সহকারি শিক্ষক এ কে এম মঞ্জুরুল হকের সাথে। তিনি জানালেন, যাতায়াত খুব একটা ভালো না হলেও এই সুন্দর ভাসমান হাট দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছেন তারা। পার্শবর্তী দেশের মতো এরকম পর্যটন এলাকাগুলো চিহ্নিত করে এর পৃষ্ঠপোষকতা করতো তাহলে দেশের যেমন উন্নয়ন হতো তেমনি স্থানীয় লোকেদের জীবনযাত্রা পাল্টে যেতো।

    ৬ সদস্যের তরুণ পর্যটক গ্রুপের রাহাত হানিফ ভুঁইয়া এসেছেন চট্টগ্রাম থেকে। তিনি বললেন, দেশের কক্সবাজার-কুয়াকাটা অনেকেই যায়। কিন্তু থাইল্যান্ডের মত এই ভাসমান হাট দেখার সুযোগ রয়েছে। তাই বন্ধুরা মিলে ঠিক করলাম এখানেই আসব। এসে অবাক! এত কম মুল্যে পেয়ারা দেশের আর কোথাও পাওয়া যাবে না। এখানে এসে আমরা আরও অনেক পর্যটকের দেখা পেলাম। আমরা অভিভুত। এটা আমাদের নতুন অর্জন। যে কেউ ইচ্ছে থাকলে প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।

    পর্যটক বরিশাল বিএম কলেজের ছাত্রী আবিবা আকন্দ জানান, উন্নত যোগাযোগ আর থাকার জন্য হোটেল-মোটেলের ব্যবস্থা থাকলে ভীড় বারত পর্যটকদের। নিজের সৌন্দর্য আর সুনামে প্রকৃতিক উপায়ই এটি হয়ে উঠেছে পর্যটন কেন্দ্র। কিন্তু স্থানীয়ভাবে এখনও এর বিকাশে বা উন্নয়নে কেউ কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় একটু সমস্যা হচ্ছে।

    এখানকার আড়ৎদার কালাম গাজী বলেন, ৪০ বছরের ঐতিহ্য হওয়া সত্ত্বেও কেউ এর বিকাশে এগিয়ে আসেনি। পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও স্বস্তিতে নেই কৃষক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। উন্নত যোগাযোগ, পর্যটকদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা, আর হিমাগার ও জ্যাম জেলির কারখানার অভাবে ব্যবসায়ীক সাফল্য থেকে যুগের পর যুগ বঞ্চিত আমরা।

    স্বরূপকাঠি কৃষি বিভাগের আটঘর-কুঁড়িয়ানার উপসহকারি কর্মকর্তা সুখলাল হালদার বলেন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নিলে লাভবান হতো কৃষক। কিন্তু এ বিষয়ে কোন উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেয়া হয় নি। একটি জ্যাম জেলি প্রস্তুত কারখানা গড়ে উঠলেই বদলে যেতো কয়েক হাজার কৃষকের ভাগ্য। পর্যটন শিল্পেও উন্মোচিত হতে পারে অপার সম্ভাবনার দ্বার। শুধু প্রয়োজন সঠিক পদক্ষেপ।

    এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, সম্ভাবনাময় এই ভাসমান হাটকে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র করে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আন্তরিক হবেন সরকার এবং উদ্যোক্তারা।